৩ অক্টোবর ২০২৫, রোহিঙ্গা ছাত্র জুনায়েদ মাহমুদ ( বিশ্লেষণে মাহবুব আলম মিনার)
১৯৯২ সালে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বেদনার স্মৃতি ও ২০১৭ সালের গণহত্যা-প্রবাহে আসা রোহিঙ্গাদের কষ্ট—এই দুই যুগের অভিজ্ঞতা একই সূত্রে গাঁথা বলে লিখেছেন রোহিঙ্গা ছাত্র জুনায়েদ মাহমুদ। তার আলোচনা আমাদের সামনে রাখে কয়েক দশক আগের উপশমহীন ঘাত ও সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগে আসা নতুন প্রজন্মের ভিন্ন প্রতিফলন।
লেখক বর্ণনা করেছেন, ১৯৯২ সালে যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের দিনগুলো ছিল ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা, অপমান ও বেঁচে থাকার সংগ্রামে ভরা। “প্রাণ বাঁচাতে ঘর-বাড়ি, জমি-জায়গা, আপনজন ছেড়ে আসা” তৎকালীন রোহিঙ্গারা কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়েই জড়িয়ে ছিলেন—তবু তারা ধৈর্য ধরেছিল এবং একদিন তাদের কণ্ঠস্বরও পৃথিবী শুনবে এই আশায় ছিল।
তারপরে ২০১৭ সালের ব্যাপক নিপীড়ন ও গণহত্যার ফলে লাখো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে, স্থানীয় পুরনো বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারাই প্রথম দিক থেকে তাদের পাশে দাঁড়ায়। নিজেরা না খেয়ে নতুন আগন্তুকদের খাওয়ানো, নিজের ঘর ছেড়ে দেয়া, কাপড়-চোপড় ও জরুরি সামগ্রী ভাগ করে নেওয়া—এসব ত্যাগের কথা জুনায়েদ স্মরণ করেছেন। সীমান্তে দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবনঝুঁকি ঝুঁকিয়ে সাহায্য করাই ছিল তাদের অঙ্গীকার।
কিন্তু গতকয়েক বছরে যেন সেই ত্যাগ বিস্মৃতির কবলে পড়েছে—লেখক অনুভব করেন, ২০১৭ সালের পর আগত অনেকেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলছে, সেমিনারে যাচ্ছে, তাদের কাহিনি তুলে ধরছে; অথচ প্রারম্ভিক ১৯৯২ সালের বাস্তুচ্যুতদের কণ্ঠস্বর সেখানে শোনা যায় না। “যেন আমরা তাদের কাছে রোহিঙ্গাই নই” — এমন ব্যথা লেখকের ভাষায় প্রতিফলিত হয়।
জুনায়েদ প্রশ্ন তোলেন:
আমরা কি ভিন্ন কোনো জাতি? তিনি জোর দিয়ে বলেছেন—না, আমরা সবাই একই ইতিহাসের সন্তান। কারো আগমনের সাল বা সময়ে ভিন্নতা থাকলেও রক্তের সম্পর্ক, সংগ্রামের স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয় একই। পুরাতন ও নতুন—এই বিভাজন দূর হলে আরও শক্ত হয়ে রোহিঙ্গা জাতি নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে এগোবে বলে তিনি মনে করেন।
লেখক দাবি করেছেন—
তাদের ত্যাগ ও অবদান স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। তিনি অনুরোধ করেন, পুরাতন বাস্তুচ্যুতদের কথা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরা হোক, তাদের ইতিহাস ও কষ্টও যেন সমানভাবে বিবেচিত হয়। অন্যথায় ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই প্রবন্ধটি একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিলেখা হলেও, জুনায়েদ মনে করিয়ে দেন যে—রোহিঙ্গাদের সংগ্রাম একরকম; পুরোনো বা নতুন বিভাজন ছাড়াই ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করা প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই রোহিঙ্গা — “একই রক্তে রঞ্জিত ইতিহাসের সাক্ষী”।
আই টি এন নিউজের সম্পাদক মাহবুব আলম মিনারের মন্তব্য:
জুনায়েদের লেখায় পুরোনো বাস্তুচ্যুতদের অনুভূতি ও ২০১৭ পরবর্তী প্রজন্মের তুলনামূলক অবস্থান—দুটোর মধ্যকার সংকট ও দূরত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এই রচনা আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা তক্তি খুলে দিয়েছে: সহমর্মিতা ও সম্মান স্থানীয়ভাবে ও আন্তর্জাতিকভাবে কিভাবে সকল রোহিঙ্গার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা যায়।