মাহবুব আলম মিনার। ২৪ মার্চ ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে।
ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই নাগাল্যান্ড, মিজোরামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব অঞ্চলের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
১৯৩৭ সালে প্রশাসনিক কারণে ব্রিটিশরা তৎকালীন বর্মা (বর্তমান মিয়ানমার)কে ভারত থেকে আলাদা করে। এর ফলে নাগা, কুকি ও মিজোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে।
স্বাধীনতার প্রাক্কালে খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকাগুলো নিয়ে পৃথক প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দেয় ব্রিটিশ সরকার। তবে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসসহ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর একটি অংশ। পরবর্তীতে দেশভাগের সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতের মিজো, কুকি এবং মিয়ানমারের চিন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মিলের কারণে ‘জো’ পরিচয় সামনে এসেছে, যা নতুন করে আঞ্চলিক রাজনীতিকে জটিল করে তুলছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকা এবং এর ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সামরিক ও প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনার বিষয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।
সম্প্রতি মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা এক মন্তব্যে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা মিয়ানমারে প্রবেশের জন্য মিজোরামকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে।
এদিকে, ২০২৪ সালে মণিপুরে কুকি ও মেইতেই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একই সময়ে মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পুরো অঞ্চলটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলও আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে এ ধরনের সম্ভাব্য তৎপরতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত অবস্থানই নির্ধারণ করবে অঞ্চলের পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে।
( আনন্দ বাজার পত্রিকার সূত্র ধরে)