রফিকুল ইসলাম। ৪ এপ্রিল ২০২৬
একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে’ চলে আসা হামের প্রাদুর্ভাব, আবারও নীরবে ফিরে এসে আমাদের মাঝে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে, এ রোগের সংক্রমণ বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য ব্যাঘাতও এ সংক্রামক রোগটি দেশের সব জায়গায় দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে (EPI)-এর মাধ্যমে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় টিকা গ্রহণে অনীহা, সচেতনতার ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকি আবারও বাড়ছে।
হাম ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং আশেপাশের অ-টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সহজেই সংক্রমিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় ৯০ শতাংশ সংবেদনশীল মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। রোগের শুরুতে সাধারণ জ্বর-সর্দির মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাই অনেক সময় অভিভাবকরা বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—উচ্চ জ্বর, শুকনো কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে পানি পড়া, মুখের ভেতরে কপলিক স্পট এবং ৩–৫ দিনের মধ্যে লালচে ফুসকুড়ি, যা মুখ থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এবং এক পর্যায়ে শিশুর অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়। এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু, কম বয়সী শিশু এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দেশে হাম সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো কিছু এলাকায় টিকাদান কর্মসূচির বাইরে শিশু থাকা, অপুষ্টির উচ্চ হার, গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহা এবং গুজব বা ভুল ধারণার কারণে টিকা নিতে অনাগ্রহ।
হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। এমআর (Measles-Rubella) টিকা নির্ধারিত সময়ে নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পাওয়া যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া উচিত। কোনো কারণে টিকা মিস হলে দ্রুত ক্যাচ-আপ টিকা নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা নয় সঠিক পুষ্টিও হাম মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন A সাপ্লিমেন্ট জটিলতা কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টিকর খাবার এবং বিশ্রাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জানিয়েছে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় হাম সংক্রমণ আবার বাড়ছে। সময়মতো টিকা না নিলে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হাম প্রতিরোধযোগ্য হলেও অবহেলা করলে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।