মাহবুব আলম মিনার। ২ এপ্রিল ২০২৬
ত্রিপুরা থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন উম্মে সালমা জান্নাত। ভালোবেসে বিয়ে করেন কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মিজবা উদ্দিন মানিককে। স্বপ্ন ছিল ছোট্ট একটি সুখী সংসার গড়ার। সেই সংসারেই জন্ম নেয় তাদের দেড় বছরের কন্যা সন্তান। কিন্তু মেয়ে শিশু জন্ম নেওয়া যেন হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ। কেন কন্যা সন্তান জন্ম নিল!
অভিযোগ উঠেছে, কন্যা সন্তান জন্মের পর থেকেই উম্মে সালমা জান্নাতের ওপর শুরু হয় শাশুড়ি, ননদ, ভাশুর এবং স্বামীর অমানবিক নির্যাতন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে গেল রমজান মাসে তাকে মারধর করে দেড় বছরের শিশু কন্যাকে কেড়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
অসহায় অবস্থায় আশ্রয়ের খোঁজে আলীকদমে একটি মুসলিম পরিবারের বাড়িতে ঠাঁই নেন এই নব মুসলিম নারী। কিন্তু বুকের দুধের শিশু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দিন দিন শারীরিকভাবে ভেঙে পড়তে থাকেন তিনি। মাতৃত্বের আকুতি আর সন্তানের জন্য হাহাকার তাকে অসুস্থ করে তোলে।
ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর বিষয়টি পৌঁছে যায় মানবিক চিকিৎসক ডা. ইউসুফ আলীর কাছে। তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কক্সবাজারের সাংবাদিক মাহবুব আলম মিনারসহ পাঁচ সদস্যের একটি টিম নিয়ে আলীকদমে গিয়ে নির্যাতিত নারীর খোঁজখবর নেন।
সকল ঘটনা জেনে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিশুটিকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই কাজে পেকুয়া গিয়ে সহযোগিতা করতে দায়িত্ব দেওয়া হয় সাংবাদিক মাহবুব আলম মিনারকে। পরে কক্সবাজারের এক উচ্চ পর্যায়ের সরকারি গোয়েন্দা কর্মকর্তার সহযোগিতায় বিষয়টি পেকুয়া থানার অফিসার ইনচার্জকে অবগত করা হয়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয় পুলিশ। অফিসার ইনচার্জের নির্দেশে এসআই সুনয়ন বড়ুয়ার নেতৃত্বে একটি দল গঠন করা হয়। এস আই সুনয়ন বড়ুয়া রাত ৮টার দিকে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের উত্তর মেহেরনামা এলাকার আধাঁখালী হাজী বাড়ি গ্রামে সাইফুল হকের বাড়িতে অভিযান চালায় ।
অভিযুক্তরা বাড়িতে না থাকলেও স্থানীয় সাংবাদিক ও মহিলা ইউপি সদস্যের সহযোগিতায় অভিযুক্তদের পিতা সাইফুল হক নাতনী কে নিয়ে পুলিশ সাথে এসে থানায় উপস্থিত হন। তিনি নিজেই নাতনীর উপর নির্যাতনের বিষয় স্বীকার করেন এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানান। পরে তার মাধ্যমেই মহিলা মেম্বারের মাধ্যমে দেড় বছরের শিশুটিকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ দেড় মাস পর সন্তানের স্পর্শ পেয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন উম্মে সালমা জান্নাত। বুকভরা কান্না আর স্বস্তির সেই মুহূর্তটি হয়ে ওঠে হৃদয়বিদারক অথচ স্বস্তিদায়ক এক দৃশ্য।
পেকুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, এটি একটি মানবিক উদ্যোগ। পুলিশ যথাযথ সহযোগিতা করেছে এবং স্থানীয়ভাবে বিষয়টির সমাধান করে শিশুটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ডা. ইউসুফ আলী বলেন, “আমি একজন চিকিৎসক হলেও মানুষের সেবাই আমার মূল লক্ষ্য। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার মুসলিম-অমুসলিম সকল মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি। এই মানবিক কাজ ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাব।” এই কাজে আমার সাথে কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীরাও রয়েছে।
এদিকে নব মুসলিম উম্মে সালমা জান্নাত কে আশ্রয় দেওয়া আলীকদমের মুসলিম পরিবার টি তার ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দ্বায়িত্ব নিয়েছেন।
একটি অসহায় মায়ের বুকের কান্না থামাতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সম্মিলিত এই উদ্যোগ আবারও প্রমাণ করলো—মানবতা এখনো বেঁচে আছে।