মাহবুব আলম মিনার। ৭ এপ্রিল ২০২৬
উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসতঘর ভাঙাকে কেন্দ্র করে এক চাঞ্চল্যকর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) রিন্টু বিকাশ চাকমার বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল ২০২৬) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে উখিয়ার ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-৪ ব্লকে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী হোসনারা (৪০), স্বামী পরিত্যক্তা এক নারী, অভিযোগ করেন—বিগত কয়েক মাস আগে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্যাম্প-১৬ এর সি-৪ ব্লকের অসংখ্য রোহিঙ্গা বসতি পুড়ে যায়। পরবর্তীতে সিআইসির নির্দেশে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিজেদের উদ্যোগে পুনরায় ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করে। সে সময় সিআইসি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, নতুন ঘর নির্মাণের জন্য কোনো এনজিও বা আইএনজিওর বাজেট নেই।
কিন্তু ঘটনার পাঁচ দিন আগে হঠাৎ করে সিআইসি পিন্টু বিকাশ চাকমা ব্লকবাসীদের ডেকে জানান, “আমান” নামের একটি এনজিওর মাধ্যমে নতুন ঘর দেওয়া হবে। এতে কিছু রোহিঙ্গা অনাগ্রহ প্রকাশ করে, কারণ তারা নিজেদের তৈরি ঘরেই থাকতে চেয়েছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট এনজিওর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে সিআইসির বিরুদ্ধে। এরপর অনিচ্ছুক পরিবারগুলোর ঘর উচ্ছেদে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
ঘটনার দিন সিআইসি, মাঝি, লেবার, “আমান” এনজিওর লোকজন এবং এপিবিএন পুলিশের উপস্থিতিতে জোরপূর্বক ঘর ভাঙা শুরু হয়। এ সময় হোসনারা তার ঘর ভাঙার দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করতে গেলে সিআইসি নিজে তার ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মোবাইলটি নিজের শরীরের ভেতরে লুকিয়ে রাখলে সিআইসি রিন্টু বিকাশ চাকমা জোরপূর্বক তার শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত ঢুকিয়ে মোবাইলটি নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে তিনি মারাত্মকভাবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হন।
এতেই থেমে থাকেননি অভিযুক্ত সিআইসি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি হোসনারার ১৬ বছর বয়সী কন্যাকে জোরপূর্বক নিয়ে যান এবং হুমকি দেন—এক ঘণ্টার মধ্যে সিআইসি অফিসে হাজির না হলে মেয়েকে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হবে।
পরবর্তীতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে হোসনারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাম্প-১৬ এর সিআইসি রিন্টু বিকাশ চাকমা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি এবং ফোন কল কেটে দেন।
উখিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, “কোনো নারীর শরীরে এভাবে হাত দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়।” তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
মানবাধিকার ও আইনি
বিশ্লেষণ:
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ (আইনের দৃষ্টিতে সুরক্ষা) ও অনুচ্ছেদ ৩২ (ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা) লঙ্ঘনের শামিল। এছাড়া নারীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি ৩৫৪ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিশেষ করে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) অনুযায়ীও এ ধরনের আচরণ গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঘটনাটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।