মাহবুব আলম মিনার। প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিব উল্লাহ কে হত্যার ৪ বছরেও মাস্টারপ্ল্যান কারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
চার্জশিটের বাইরে ‘মিয়ানমারের এজেন্টরা’—ক্যাম্পে প্রকাশ্যে ঘুরছে হত্যার পরিকল্পনাকারী ডাক্তার জুবায়ের, ফারুক সহ অনেকেই।

চার বছর আগে রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের মুখ হয়ে ওঠা নেতা মুহিব উল্লাহকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—কে দিল সেই নির্দেশ, আর কেন চার্জশিটের বাইরে রয়ে গেল মূল পরিকল্পনাকারীরা?

হত্যার আগেই হুমকি, পরিকল্পিত ফাঁদ, অফিসে ডেকে আনা—সবই ছিল হত্যাকারীদের সাজানো চিত্রনাট্যের অংশ।

তবুও রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ হত্যায় যাদের নাম উঠে এসেছে পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে, তারা নেই মামলার তালিকায়।
একজন মানুষ শুদু মুহিব উল্লাহ হত্যা নয়, মুহিব উল্লাহর সাথে হত্যা করা হয়েছিল রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন।
আজ চার বছর পর তার পরিবার, সহযোদ্ধা ও সাক্ষীরা বলছেন—এই হত্যা ছিল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিব উল্লাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার চার বছর পার হলেও আজও উন্মোচিত হয়নি এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ রহস্য। পরিবারের অভিযোগ—সঠিক তদন্ত না হওয়ায় মূল পরিকল্পনাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মামলার এজাহার ও চার্জশিটে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নাম ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ নিহত মুহিব উল্লাহর পরিবার দাবি করছে—তারা তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে শুরু থেকেই সব তথ্য, নাম ও প্রমাণ তুলে ধরেছিল।
বিদেশে অবস্থানরত মুহিব উল্লাহর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে তারা আমাদের অনুসন্ধানী টিমকে জানান—হত্যাকাণ্ডে জড়িত একাধিক ব্যক্তি কীভাবে মামলা থেকে বাদ পড়ল, তা আজও তাদের কাছে রহস্য।
মুহিব উল্লাহর বড় ছেলে হাসমত উল্লাহ সরাসরি অভিযোগ করেন, তার পিতার হত্যার পেছনে মিয়ানমারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে ডাক্তার জুবায়ের। তার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে ছিলেন ফারুক, মোরশেদ, আবদুর রহিম ওরফে রকিম, মোজাম্মেল ওরফে লাল বদাইয়া, মো. সিরাজ, সৈয়দ আলম, নুর সাবা, মো. রফিক, খায়রুল আমিনসহ আরও অনেকে।
এই নামগুলো তদন্ত কর্মকর্তাদের জানানো হলেও চার্জশিটে সেগুলোর অনেকটাই নেই।
অনুসন্ধান আরও গভীরে গেলে মুহিব উল্লাহর গঠন করা সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (ARSPHR)–এর অন্তত পাঁচজন সদস্য ক্যামেরার সামনে জানান—ডাক্তার জুবায়ের সরাসরি হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন।
তাদের ভাষ্যমতে, হত্যার কয়েকদিন আগে মুহিব উল্লাহকে সরাসরি ও মোবাইলে একাধিকবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এরও এক মাস আগে চট্টগ্রাম থেকে মোটোফোনে হুমকি দিয়েছিল কুকুলিং নামে আরেক রোহিঙ্গা। মুহিব উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আগে ভীত হয়ে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যান। ঠিক সেই সময় ডাক্তার জুবায়ের তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফারুককে দিয়ে মুহিব উল্লাহকে কৌশলে আবার অফিসে ডেকে আনেন।
উদ্দেশ্য একটাই—অস্ত্রধারী খুনিরা যাতে মুহিব উল্লাহর অফিসে সহজে পৌঁছানোর সময় পায়। ঠিক পরিকল্পনা মতে অল্প সময়ের মধ্যেই মাথায় টুপি, মুখে মাস্ক পরা সাত থেকে আটজন সশস্ত্র ব্যক্তি ARSPHR অফিসে ঢুকে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী মুহিব উল্লাহর সংগঠনের এক সদস্য জানান—তারা পিস্তল ঠেকিয়ে মুহিব উল্লাহকে বলে, ‘তুমি ব্লকে ব্লকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কাজ করছো কেন?’ এই কথা বলে পিস্তল মাথায় টেঁকিয়ে রাখে। হত্যাকারীদের করা প্রশ্নই স্পষ্ট করেছে—হত্যার লক্ষ্য ছিল প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করা, রোহিঙ্গা নেতৃত্বকে শূন্য করা এবং ক্যাম্পে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মিয়ানমারের পরিকল্পিত নির্দেশনায় আরসা থেকে বের হয়ে যাওয়া কিছু সাবেক কমান্ডার ও সদস্যকে ব্যবহার করা হয় এই হত্যাকাণ্ডে। উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গাদের নেতৃত্ব শূন্য করা, প্রত্যাবাসনে বাধা সৃষ্টি করা, রোহিঙ্গাদের মুক্তিকামী সংগঠন আরসাকে কোণঠাসা করা এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ভয় তৈরি করা। সবই পরিকল্পনা মাফিক বাস্তবায়ন করা হয়।
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, রাত ৮টায় মুহিব উল্লাহর নিজ কার্যালয়ে এসে তার বুকে পরপর তিনটি গুলি করা হয়। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে আবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তখন আরেক সন্ত্রাসী তার বুকে ও চোখে আরও দুটি গুলি চালায়। আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হত্যাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়।
এই হত্যার পর যেখানে নিহতের পরিবার থানা ও মর্গে দৌড়াচ্ছিল, সেখানে অভিযোগ রয়েছে—ডাক্তার জুবায়েরের নির্দেশে তার সহযোগী ফারুকের বাড়িতে হত্যার ‘সফল মিশনে অংশ নেওয়াদের’ খাবারের আয়োজন করা হয়।
হত্যার পর থেকেই ডাক্তার জুবায়ের নিজেকে মুহিব উল্লাহর সংগঠনের চেয়ারম্যান দাবি করে আসছে। মুহিব উল্লাহর পরিবার বলছে—এটাই প্রমাণ করে, হত্যা ছিল ক্ষমতা দখলের অংশ। ডাক্তার জুবায়েরের পেছনের ক্ষমতা হিসেবে কাজ করছে মিয়ানমারের আরেক এজেন্ট উমং জাবের।
এদিকে ডাক্তার জুবায়েরের একান্ত সহযোগী ফারুক হত্যার পর গা ঢাকা দিলেও এখন প্রকাশ্যে তার সঙ্গে কাজ করছে।
ট্রানজিট ক্যাম্পে থাকা মামলার রাজসাক্ষী জিয়া উদ্দিন জিয়া ক্যামেরার সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—চার বছরেও তারা ন্যায়বিচারের কোনো আলো দেখছেন না। সন্তানদের জীবন অনিরাপদ, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
তার সরাসরি অভিযোগ—ডাক্তার জুবায়েরই এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, ফারুক তার সহযোগী।
অনুসন্ধান টিমের কাছে হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলা প্রত্যেক সাক্ষীর পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। প্রশাসন চাইলে সব তথ্য সরবরাহ করা যাবে।
মুহিব উল্লাহর স্বজনদের প্রশ্ন—আর কত বছর লাগবে এই হত্যার আসল মাস্টারমাইন্ডদের মুখোশ খুলতে?
চার বছর আগে গুলিতে থেমে যায় মুহিব উল্লাহর কণ্ঠ। কিন্তু থেমে যায়নি প্রশ্ন। পরিবার, সহযোদ্ধা ও সাক্ষীরা আজও অপেক্ষায়—একটি নিরপেক্ষ তদন্ত, একটি দৃশ্যমান বিচার। মুহিব উল্লাহ হত্যার ন্যায়বিচার শুধু একজন মানুষের নয়—লাখো রোহিঙ্গার আস্থার প্রশ্ন।