তুম্ব্রু (নাইক্ষ্যংছড়ি) থেকে — অনুসন্ধানে প্রতিবেদক: মাহবুব আলম মিনার
১১ নভেম্বর ২০২৫ ইং
তুম্ব্রু বাজারের ঠিক দক্ষিণ পাশে অবস্থিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় দিনদুপুরে সৌন্দর্যের আড়ালে ব্যাপক নৈরাজ্যের ছবি আমরা সরেজমিনে দেখেছি—আরাকান আর্মির সহযোগীতা তথা তাদের সুবিধাভোগে বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল ও অকটেন তৈল ইত্যাদি পণ্য চোরাচালানের ঘটনাটি প্রতীয়মান হলো। সোমবার (১১ নভেম্বর ২০২৫) বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের সময় থেকে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট সীমান্তে বসবাসকারী সাধারণদের মাঝে মিশে আমরা এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি।
সীমান্ত নিরাপত্তা সূত্রে এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়—সীমান্তের কাটা তারের বেড়ার এক অংশ কেটে আরাকান আর্মির সদস্যরা গেট বা দরজার সদৃশ একটি পথ তৈরি করেছেন। ওই দরজাটি বাঁশ, রশি ও কাটা তার দিয়ে তৈরি; উচ্চতা আনুমানিক ৫-৬ ফুট। আমরা দেখেছি, যুবকরা মালামাল নিয়ে যাওয়ার সময় এই পথটি খুলে দেওয়া হয় এবং পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৭-৮ জন আরাকান আর্মির সদস্য তা তদারকি করেন। এরপর মালামাল কাঁদে করে-চোরায় দ্রুত পারাপার হয়ে মিয়ানমার ঐপাড়ে নেওয়া হচ্ছে।
সীমানার ওই অংশে দিনের বেলায়ই চোরাকারবারি কাজে জড়িত প্রায় ১০০ জনেরও বেশি স্থানীয় যুবক দেখা গেছে।
বিজিবির নিকটস্থ ডিউটিতে থাকা সীমিত সংখ্যক সদস্যের সামনে—সেদিন কয়েকজন চোরাকারবারি উল্টো আরাকান আর্মিদের পাশে গিয়ে বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশে উস্কানিমূলক আচরণ করছিল। উপস্থিত এক বিজিবি সদস্য (নাম—সুমন) আমাদের সঙ্গে কথা বলে জানান, তিনি একা একাই কয়েকবার দৌড়ে চোরাকারবারিদের ধরতে চেয়েছেন তা আমরাও স্পষ্ট চোখে দেখেছি । সুমন বলেন, “দেশপ্রেম আছে অন্তরে—দোষীদের ছাড় দেওয়া যাবে না। যদি নিয়মিত ১২ জন বিজিবি সদস্য এখানে টহল দেয়, প্রতিদিন হাজার কেজি (প্রায় ১ টনের মত) মালামাল জব্দ করা যেত, চোরাকারবারিও আটক করার সম্ভব ।” তাঁর মতে সীমান্তে টহলবল বাড়ালে ব্যাপক রোধশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব।
আমরা সীমান্তে অবস্থানকালে দেখেছি—আক্রান্ত কাটা তারের মধ্যবর্তী ঐ পথ দিয়ে মালামাল পারাপার হচ্ছে; বস্তার ভেতরে চাল, ডাল ও তেল থাকা প্রতীয়মান ছিল। উপস্থিত বর্ণনাকারীদের কাছে জানতে পেরেছি, আরাকান আর্মির শিক্ষিত কিছু সদস্যও সরাসরি টহল দিচ্ছেন এবং স্থানীয় এই পারের কিছু মারমা জনগোষ্ঠীর নারী কৌশলে আরাকান আর্মির জন্য ক্রয় মালের টাকা-লেনদেনও করে থাকেন। স্থানীয় এক চাষি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সে জানান ওই দুই নারী নাইক্ষ্যংছড়ি-সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা। আমাদের দেখা মতে আরাকান আর্মির সদস্যরা রসদপাতির বিনিময়ে মাদক (ইয়াবা, আইস ইত্যাদি) বিতরণ করেছে মনে হচ্ছে । যার ফলে অনেক সীমান্তের যুবক চোরাকারবারিতে সম্পৃক্ত হচ্ছে বলেও স্থানীয়রা জানান।
সীমান্তের ঘটিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জনপদ রক্ষার প্রয়োজনে স্থানীয়রা দাবি করেন—বিজিবি সদস্য সংখ্যা বাড়ানো, কাটাছেঁড়া করা বেড়ার ওই পথে পুরোপুরি বাধা দেয়া ও সীমান্তবর্তী প্রতিটি বাড়িতে সরকারি পর্যায়ে সতর্কতা ও নজরদারি জোরদার করা হোক। তারা আরও বলেন, “আরাকান আর্মির বেপরোয়া চলাচল ও স্থানীয় যুবকদের টাকার লোভে ব্যবহার করা যুবকদের বন্ধ করতে না পারলে সীমান্তে নিরাপত্তাহীনতা আরো বাড়বে।” উখিয়া উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাকুর মাহমুদ চৌধুুরী বলেন, “সীমান্ত এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়—বিজিবি সদস্যদের টহল বাড়ানো ও কাটা তারের বেড়া মজবুত না করলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।”
স্থানীয়রা প্রশাসনের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান—বিশেষ করে (১) কাটা তারের মাধ্যমে তৈরি হওয়া অননুমানিক পথটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, (২) সীমান্তে টহলকারী বিজিবি সংখ্যা বাড়ানো ও আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে সমর্থন করা, (৩) সীমান্তবর্তী যুবকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা জাগানো প্রয়োজন। স্থানীয় সচেতন মহল সতর্ক করেছেন—আরাকান আর্মির এই বেপরোয়া কার্যকলাপ দীর্ঘমেয়াদি হলে সীমান্ত জনপদ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তা মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
আমরা ঘটনার সময় কৌশলে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেছিলাম; স্থানীয়দের কাছে জানালাম আমরা এনজিওতে চাকরি করি এবং সীমান্ত দেখতে এসেছি। দিনের ওই পর্যবেক্ষণে ভিডিও ধারন করতে গিয়ে নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক অংশ ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তবে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপরের তথ্য এবং স্থানীয়দের বর্ণনা আমরা যাচাই করে রিপোর্ট টি তৈরি করেছি কিছু অল্প ভিডিও ধারণও করেছি ।
নোট: ঘটনাস্থল ও উপস্থিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার কারণে কিছু নাম ও ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ থেকে বিরত থাকানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে: মাহবুব আলম মিনার ও শাকুর মাহমুদ চৌধুরী , তুম্ব্রু সীমান্ত নাইক্ষ্যংছড়ি।