এক্সক্লুসিভ – প্রতিবেদন
প্রতিবেদক: মাহবুব আলম মিনার
১৬ নভেম্বর ২০২৫
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম বারবার উঠে আসে। শুধু স্থানীয় জনগণই নয়, কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকেও এখন সরাসরি জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে এই বিপদের মধ্যেই আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় বাংলাদেশ নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
সোমবার (১০ নভেম্বর) বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ–এর আগমুহূর্তে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রকাশিত ‘নো এসকেপ–২: দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম পরিচালনায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ‘গ্লোবাল লিডার’।
চরম ঝুঁকিতে রোহিঙ্গা শিবির
ইউএনএইচসিআর জানায়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মানবিক বসতি। বর্ষাকালে এখানে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও সাইক্লোনের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। খাড়া পাহাড়ি ঢালে বাঁশ–ত্রিপলের ঘরগুলো প্রতি বছরই ধসের শিকার হয়। নিচু এলাকায় বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবে যায়, ভোগান্তি লেগেই থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ১৫টি শরণার্থী বসতির একটি হবে কক্সবাজার, যেখানে বছরে প্রায় ২০০ দিন পর্যন্ত বিপজ্জনক তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে।
প্রশংসনীয় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা
ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমকে বিশ্বে অনন্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে—
১. দেশের সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক:
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির দুই লাখেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী দুর্যোগের আগে সর্বত্র সতর্কতা ছড়িয়ে দেন—এমন উদাহরণ পৃথিবীতে আর নেই।
২. জাতীয় সতর্কবার্তা সরাসরি রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছায়:
বাংলাদেশের জাতীয় অ্যালার্ট সিস্টেম এখন রোহিঙ্গা শিবিরের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে সময় নষ্ট না হয়ে সরাসরি শরণার্থীদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়।
৩. প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী:
এটিকে বিশ্বের যেকোনো শরণার্থী শিবিরে সবচেয়ে বড় কমিউনিটি–বেইসড আর্লি অ্যাকশন সিস্টেম হিসেবে উল্লেখ করেছে ইউএনএইচসিআর।
ন্যাপ ও এনডিসিতে শরণার্থী অন্তর্ভুক্ত নেই
প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের ৩০টি শরণার্থী–আশ্রয়দাতা উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই এখনো জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) তৈরি করেনি।
যেসব দেশ ন্যাপ তৈরি করেছে, তাদের বেশির ভাগই শরণার্থীদের উল্লেখ করেনি—এর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু অভিযোজনের জন্য যেসব অর্থ প্রয়োজন, তার খুব কম অংশই পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্বে ২৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত
ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, জলবায়ু সংকট ও সংঘাতের কারণে গত এক দশকে ২৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ বাসস্থান হারিয়েছে।
২০২৪ সালে সংস্থাটি যতবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, তার এক–তৃতীয়াংশ ছিল বন্যা, খরা, দাবানলসহ চরম আবহাওয়ার কারণে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি সতর্ক করে বলেন—
“তহবিল কমে যাওয়ায় শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত পরিবারকে চরম জলবায়ু প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের ওপরই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।”