আবিদুর রহমান আবিদ। ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
কুমিল্লার লালমাই পাহাড় বলতেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত রুক্ষ লাল মাটি আর অনাবাদি টিলার দৃশ্য। তবে সেই চেনা দৃশ্যপট এখন আমূল বদলে গেছে। কুমিল্লার বড় ধর্মপুর এলাকায় সড়কের পূর্ব পাশের সরু পথ ধরে মাত্র দুইশত গজ এগোলেই বদলে যায় পরিবেশ। পাহাড়ের ঢালজুড়ে সারিবদ্ধ চা-গাছ দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজের কারুকাজে আঁকা কোনো নকশা।
প্রথম দর্শনে অনেকেই বিভ্রমে পড়েন—এটি কি কুমিল্লা, নাকি মৌলভীবাজার-এর কোনো চা বাগান? লালমাইয়ের রুক্ষ মাটির বুক চিরে গজিয়ে ওঠা সতেজ চা-পাতা যেন এই পাহাড়ের নতুন পরিচয় গড়ে দিয়েছে।
মাটির গোপন রসায়নেই সম্ভাবনার দুয়ার
ভূতাত্ত্বিকভাবে লালমাই পাহাড়ের মাটি লেটারাইট বা আয়রন অক্সাইড সমৃদ্ধ, যা কৃষিবিজ্ঞানীদের কাছে ‘টেরা রোসা’ নামে পরিচিত। এই অম্লীয় মাটি ও পাহাড়ের ঢালু গঠন চা-গাছ—Camellia sinensis—এর জন্য অত্যন্ত উপযোগী। প্রকৃতির এই বৈশিষ্ট্যই কুমিল্লাকে নতুন করে চা উৎপাদনের সম্ভাবনার মানচিত্রে স্থান করে দিয়েছে।
তবে সিলেট অঞ্চলের মতো এখানে অঝোর বৃষ্টি হয় না। তাই কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে চারাগাছের পানির চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, পরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থাই এই বাগানের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
রুক্ষ পাহাড়ে স্বপ্ন বুনেছেন তারিকুল ইসলাম
এই পরিবর্তনের নেপথ্য কারিগর মো. তারিকুল ইসলাম মজুমদার। যেখানে অনেকেই পাহাড়ের রুক্ষতা দেখে সম্ভাবনা খুঁজে পাননি, সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘মজুমদার টি গার্ডেন’। এখানে রোপণ করা হয়েছে উন্নত বিটি-২ জাতের চা চারা।
শুরুতে স্থানীয়ভাবে নানা সংশয় ছিল। কুমিল্লার আবহাওয়ায় চা চাষ আদৌ সম্ভব কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই। কম বৃষ্টিপাতকে বড় বাধা হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে সময়ই সেই সংশয় দূর করেছে। বর্তমানে এই বাগান থেকে প্রতিবছর কয়েক হাজার কেজি চা পাতা সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তা।
তারিকুল ইসলাম মজুমদার বলেন, “শুরুতে অনেকে সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু আমরা পরিকল্পিত সেচ ও পরিচর্যার মাধ্যমে প্রমাণ করেছি—ইচ্ছা থাকলে কুমিল্লাতেও চা চাষ সম্ভব।”
কর্মসংস্থান ও পর্যটনের নতুন দিগন্ত
সবুজের এই বিস্তার এখন শুধু সৌন্দর্যের নয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকারও উৎস। বাগানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান। শ্রমজীবী পরিবারগুলো এখন নিয়মিত কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি বিকেলের সোনালি আলোয় চা বাগানের মনোরম দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন।
পর্যটকদের আগমন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। ছোট ব্যবসায়ী ও দোকানিদের মুখেও ফুটেছে আশার হাসি।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
বাগানের তত্ত্বাবধায়ক রাজু সিং আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “একদিন লালমাই পাহাড়েও সিলেটের মতো বিস্তৃত চা বাগান গড়ে উঠবে। বাণিজ্যিকভাবে এর সম্ভাবনা অনেক।”
উদ্যোক্তারা মনে করেন, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নত সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত হতে পারে। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা থেকে জাতীয় অর্থনীতির অংশীদার হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে।
রুক্ষ লাল মাটির বুক চিরে সবুজের যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি বাগানের গল্প নয়—এটি সম্ভাবনা, সংগ্রাম ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। লালমাই পাহাড় এখন আর শুধু অতীতের রুক্ষ স্মৃতি নয়; বরং আগামীর সবুজ সম্ভাবনার প্রতীক।