হাতেগড়া ছাত্র এখন বিসিএস চিকিৎসক: প্রিয় স্যারের জন্য চেয়ারে উঠলো সম্মানের নতুন গল্প
মাহবুব আলম মিনার। ২২ নভেম্বর ২০২৫
শিক্ষককে সম্মান করার গল্প আমরা বইয়ের পাতায় পড়ি, বক্তৃতায় শুনি, কিংবা অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতায় দেখি। কিন্তু বাস্তবে এমন দৃশ্য সামনে এলে হৃদয় ঠিকই একটু কেঁপে ওঠে, ভেতরে জমে থাকা বিশ্বাস আবার জেগে ওঠে—“মানুষে মানুষে সম্পর্ক এখনো এতটাই নির্মল হতে পারে!”
এমনই এক আবেগে ভরপুর ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে। সাধারণ রোগী হিসেবে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন এক সাবেক শিক্ষক, নুরুল হোসাইন। তিনি বহু বছর আগে মরিচ্যাপালং হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। এক সময়ের দিনগুলো পার করছেন, কিন্তু শিক্ষক পরিচয় কখনোই ফুরায় না। আর সেই পরিচয়েরই দরদী প্রতিফলন দেখা গেল এক তরুণ চিকিৎসকের চেম্বারে।
চেম্বারের দরজায় স্যারের আগমন— আরেক দুনিয়া খুলে গেল
সেদিন অন্যান্য দিনের মতোই রোগী দেখছিলেন ডা. আবুল কাশেম—বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের একজন তরুণ, দায়িত্বে আছেন পিজি হাসপাতালে। দরজা খুলে যখন সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে চিনলেন, তখন তিনি যেন মুহূর্তেই সময়ের স্রোত পেরিয়ে চলে গেলেন ছাত্রজীবনে।
চোখে বিস্ময়, মনে শ্রদ্ধা, আচরণে বিনয়—একসাথে মিলেমিশে ঠিক যেন নিখুঁত এক চিত্রকর্ম।
তিনি আর অপেক্ষা করতে দিলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের চেয়ারে বসালেন শিক্ষককে।
স্যার যত বললেন—
“তুমিই বসো, তুমি ডাক্তার”
ততবারই ছাত্রের উত্তর শুধু বিনয়ের হাসি—
“স্যার, আপনি বসবেন… আমি পাশে আছি।”
ডা. কাশেম দাঁড়িয়ে থেকে ও পরে পাশে বসে চিকিৎসা করলেন। যেন চিকিৎসা নয়—এ ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর হৃদয়ের সম্পর্কের পুনরুত্থান।

একজন শিক্ষক—যার গর্বে আলো ছড়াল ঘরভরা –
চিকিৎসা নেওয়ার সময় স্যার কিছু বলতে পারেননি, কিন্তু চোখের কোণে জমে থাকা আবেগ লুকোনো যায় না। পরে বেরিয়ে এসে তিনি বলেন,

“আজ গর্বে বুক ভরে গেল। একসময়ে যার হাত ধরেছিলাম, আজ সে মানুষের সেবা করছে—এটাই বড় সম্মান। আর আমাকে যে শ্রদ্ধা দিল, তা জীবনের বড় প্রাপ্তি।”
তিনি আরও দোয়া করেন—
“আল্লাহ তাকে আরও উচ্চ পদে আসীন করুন, মানুষের সেবায় নিয়োজিত রাখুন। আমিন।”
শিক্ষক নুরুল হোসাইনের আরেক ছাত্র সাংবাদিক মাহবুব আলম মিনার বাড়ি কক্সবাজারের ইনানীতে —সে এইভাবেই প্রকাশ করলেন মানবিক মুহূর্তটি কে—–

এই ঘটনাটি শুধু শিক্ষক-ছাত্রকে নয়, স্পর্শ করেছে আরেকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে—সাংবাদিক মাহবুব আলম মিনারকে। তিনিই এই হৃদয়ছোঁয়া গল্পটি তুলে ধরেছেন মানুষের সামনে, যাতে সমাজ জানে—শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এখনো কতটা নির্মল, কতটা সম্মানের।
সমাজে যখন প্রতিদিন অসংখ্য নেতিবাচক খবর ভেসে ওঠে, সেখানে এই ধরনের ঘটনা নতুন করে আশার আলো দেখায়। মনে করিয়ে দেয়—মানবিকতা এখনো টিকে আছে, এখনও আছে ভক্তি, বিনয় এবং কৃতজ্ঞতার মতো কোমল অনুভূতি।
সম্মান—যা শিখিয়ে যায় আজীবন
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক শুধু বই-পড়ানো বা পরীক্ষা নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক বিশ্বাসের সম্পর্ক, জ্ঞানের ঋণে বাঁধা আত্মার সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্কেরই নিখুঁত ছবি আঁকলেন ডা. আবুল কাশেম।
একজন শিক্ষককে চেয়ারে বসানো—হয়তো খুব বড় কিছু মনে নাও হতে পারে, কিন্তু এর ভেতর লুকিয়ে আছে বংশপরম্পরায় বহন করার মতো বিশাল মূল্যবোধ।
এটি শেখায়—সম্মান বয়সে নয়, হৃৎপিণ্ডের গভীরে জন্ম নেয়।
শেষ কথা
আজকের এই মানবিক দৃশ্য সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। কেউ কেউ ভুলে যায় শিক্ষকতার মহত্ত্ব, কেউ হয়তো মনে রাখতে ব্যর্থ হয় ছাত্রজীবনের ঋণ। কিন্তু আবার কেউ কেউ আছে—যারা এই সম্পর্ককে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায় ধরে রাখে।
ডা. আবুল কাশেম সেই বিরল মানুষদের একজন।
এবং শিক্ষক নুরুল হোসাইন—সেই সৌভাগ্যবান পথপ্রদর্শক, যার হাত ধরে পথচলা শুরু হয়েছিল।
সময়ের স্রোত বদলায়, মানুষ বদলায়; কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কখনোই বদলায় না।