মাহবুব আলম মিনার। ১৫ মার্চ ২০২৬
একটি শয়নকক্ষের দেয়াল। সেখানে রঙের আঁচড় নেই, আছে কান্না, আর্তনাদ আর নীরব প্রতিবাদের ভাষা। ছোট ছোট হাতের লেখা প্রশ্ন—“মানুষ মানুষকে গুলি করে মারে কেন?”, “নির্দোষ মানুষ কেন মরে?”, “আব্বু, তুমি বাড়িতে কবে আসবা?”—এসব শব্দ যেন সময়ের বুক চিরে ওঠা এক পরিবারের বেদনার সাক্ষ্য।
২০১৮ সালের ২৬ মে- কক্সবাজারের টেকনাফ–এর এক রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় নিহত হন স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর মোহাম্মদ একরামুল হক। সেই ঘটনার পর থেকে একটি পরিবার শুধু একজন অভিভাবক নয়—হারিয়েছে তাদের ভরসা, নিরাপত্তা আর ন্যায়বিচারের আশা।
একরামুল হকের বাড়ির শয়নকক্ষের দেয়ালগুলো আজও সেই দিনের সাক্ষী হয়ে আছে। কোথাও লেখা—
“মানুষ মানুষকে গুলি করে মারে।”
কোথাও প্রশ্ন—
“নির্দোষ মানুষ কেন মরে?”
আবার কোথাও শিশুমনের অসহায় আকুতি—
“আব্বু, তুমি বাড়িতে কবে আসবা?”
এক পাশে বুকফাটা আর্তি—
“আমাদের আব্বু হত্যার কি কোনো বিচার পাব না?”
এসব লেখা কোনো কবিতা নয়, কোনো শিল্পকর্মও নয়। এগুলো কয়েকটি শিশুর বুকভরা শোক আর না-পাওয়া ন্যায়ের নীরব ভাষা। সেদিন তারা বাবার মৃত্যুর বিচার পায়নি, এমনকি বুকভরে কাঁদার সাহসও পায়নি। ভয় আর অসহায়তার ভেতর তারা নিজের কষ্ট লিখে রেখেছিল ঘরের দেয়ালে—যেন দেয়ালই হয়ে ওঠে তাদের ডায়েরি।
বছর পেরিয়ে আজ সেই দেয়ালের লেখাগুলো আর শুধু একটি ঘরের স্মৃতি নয়। সেগুলো জায়গা পেয়েছে গণভবন–এ স্থাপিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে। একটি পরিবারের বেদনা পেরিয়ে তা এখন রাষ্ট্রের স্মৃতির অংশ।
এই দেয়ালগুলো শুধু স্মৃতি বহন করে না—তারা প্রশ্ন তোলে।
একজন নীরবে নিহত বাবার গল্প, কয়েকটি ভেঙে যাওয়া শিশুমনের সাক্ষ্য, আর এখনো অপূর্ণ থেকে যাওয়া ন্যায়ের দাবি।
প্রশ্নটি তাই এখনো বাতাসে ভাসে—
কখনো কি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে?
কখনো কি দেয়ালের লেখা বদলে যাবে—
“আমরা বিচার পেয়েছি।”