বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
প্রতিবেদক: মাহবুব আলম মিনার | সম্পাদক আই টি এন নিউজ
কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়ায় দিনদুপুরে এক সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হামলা করা হলো। সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিলো চোখের সামনে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও কাউকে আটক করেনি। পরে ২৬ টি সংগঠনের প্রতিবাদ–মানববন্ধন, আন্তর্জাতিক সংগঠন সিপিজে’র নিন্দা, এমনকি প্রশাসনের টনক নড়ানো—কিছুই শেষ পর্যন্ত বিচার এনে দিতে পারলো না। চার বছর পেরিয়ে আজও নেই চার্জশিট, নেই আদালতের তলব, নেই মামলার অগ্রগতির কোনও খবর।
সাংবাদিক আজিম নিহাদ আজ সেই দুঃখ, বেদনা ও বঞ্চনার গল্প তুলে ধরলেন।
—
ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধান—আর তারপর নির্মম হামলা
সাংবাদিকতার শুরু থেকেই আজিম নিহাদের ঝোঁক ছিলো অনুসন্ধানে। বিপন্ন প্রজাতির হাঙর শিকার, বিদেশে পাচার ও হাঙরের তেল উৎপাদন—এ সবকিছুর গভীরে গিয়ে কাজ করছিলেন টিটিএনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক আজিম নিহাদ।
হাঙরের তেল উৎপাদনের বিষাক্ত প্রক্রিয়া, বিরল করাত হাঙরের নির্বিচার নিধন, সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের ভয়াবহ ঝুঁকি—সবকিছুর পিছনের চক্রের অনুসন্ধানে তিনি নামে সহকারী সাংবাদিক রাহুল মহাজন ও চিত্রগ্রাহক লোকমান হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে।
২০২২ সালে এক সকালে তাঁরা পৌঁছান কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ফিশারীপাড়া এলাকার একটি অবৈধ তেল কারখানায়। সেখানে ভিডিও ধারণের মাঝেই মালিক আলমগীরের ছোট ভাই প্রকাশ্যে তাদের ওপর হামলা চালায়।
এলাকাবাসীর কেউ এগিয়ে আসে না—কারণ চক্রটির ‘দাপট’। পরে পুলিশ গেলেও কাউকে আটক করা হয়নি।
“জীবন হাতে নিয়ে কাজ করেছি। আর শেষ পর্যন্ত পুরস্কার হিসেবে পেয়েছি লাঞ্ছনা, হামলা আর বিচারহীনতা”—বলছিলেন আজিম নিহাদ।
—
সাংবাদিক ইউনিয়নের নীরবতা—সবচেয়ে বড় আঘাত
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদে নামলেও, তখনকার কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের কয়েকজন নেতা আজিম নিহাদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে তাকে ‘তুচ্ছতাচ্ছিল্য’ করতে শুরু করেন।
কেউ বলেন, তিনি ‘বৈধ মিডিয়ায় কাজ করেন না’, তাই বিবৃতি দেওয়া যাবে না।
কেউ আবার তাকে ব্যক্তিগতভাবে কটাক্ষ করেন।
“বিপদে সাংবাদিক ইউনিয়ন পাশে দাঁড়াবে—এই বিশ্বাসই ভেঙে গেল সেদিন,”—কণ্ঠরোধ হয়ে আসে আজিম নিহাদের।
—
৩০টি সংগঠনের প্রতিবাদও বদলাতে পারেনি পরিণতি
কক্সিয়ান এক্সপ্রেস, রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিক সংসদ, বাপা, পরিবেশ সংগঠনসহ ৩০টিরও বেশি সংগঠন ডিসি অফিসের সামনে মানববন্ধন করে। শহীদ মিনারে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ করে বহু সাংবাদিক–সামাজিক কর্মী।
কিন্তু টিটিএন—যার জন্য তিনি জীবন ঝুঁকি নিয়ে কাজটি করছিলেন—সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান থেকে শুরু করে কোন দায়িত্বশীলই তার জন্য মাঠে এসে দাঁড়ায়নি।
—
সিপিজে বিবৃতি দিলেও… আটকে গেল বিচার
ঘটনার দুই দিন পর মানবাধিকারকর্মী রেজাউল রহমান লেলিন, সিপিজে প্রতিনিধির সঙ্গে আজিম নিহাদের সাক্ষাৎ করান।
সিপিজে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিবৃতি দেয়, কঠোর নিন্দা জানায় হামলার।
বিবৃতির পর প্রশাসন নড়ে চড়ে—এফআইআর হয়।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় আরেক অধ্যায়।
মামলার বাদী করা হয় টিটিএনের বার্তা প্রধান তৌফিকুল ইসলাম লিপুকে।
তারপর থেকেই আজিম নিহাদ মামলার কোনো অগ্রগতি—চাইলে—জানতে পারেননি।
চার বছরে তিনি জানেন না:
মামলা নম্বর কী
তদন্ত কর্মকর্তা কে
চার্জশিট হলো কি না
আলমগীর কীভাবে বাদ পড়লো
বিচার কেন এগোয়নি
“অনুসন্ধান আমার, হামলাও আমার ওপর—কিন্তু মামলার অগ্রগতি জানতে পারিনি একদিনও। এটা কি বিচারহীনতার চূড়ান্ত উদাহরণ নয়?”—প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি।
“বিচার আল্লাহর কাছে দিলাম”—আজিম নিহাদের অসহায় স্বীকারোক্তি
দীর্ঘ চার বছর অপেক্ষার পর আজিম নিহাদ বলছেন—
“যারা আমাকে প্রকাশ্যে মেরেছে, যারা বিচার থামিয়েছে—আমি তাদের বিচার আল্লাহর কাছে দিলাম। একদিন তাঁর আদালতেই বিচার হবে।”
এ যেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার আরেকটি নির্মম বাস্তবতা—
প্রকাশ্যে হামলা হয়, মামলা হয়, কিন্তু বিচার ফিরে আসে না।