মাহবুব আলম মিনার | ১৭ জুন ২০২৬
মায়ের বুকফাটা কান্না, বাবার অসহায় আহাজারি আর স্বজনদের শোকের মাতম—সবকিছুর মধ্যেই শেষ হলো মাত্র পাঁচ বছরের শিশু মোহাম্মদ এলহামের জীবনের করুণ অধ্যায়। অপহরণকারীদের দাবিকৃত ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণ পরিশোধ করেও সন্তানকে জীবিত ফিরে পাননি বাবা-মা। অপহরণের ১১ দিন পর অবশেষে মিলেছে তার নিথর মরদেহ।
কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপহরণের শিকার পাঁচ বছরের শিশু মোহাম্মদ এলহামের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এলাকার ওম বারীজা নামক একটি খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত মোহাম্মদ এলহাম বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৯ এর ডি-৮ ব্লকের বাসিন্দা মৌলানা তাবারক হোসাইনের ছেলে।
পরিবার ও ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ জুন এলহামকে কৌশলে নিয়ে যায় কয়েকজন ব্যক্তি। পরে শিশুটির পরিবারের কাছে মোবাইল ফোনে মুক্তিপণ হিসেবে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। একপর্যায়ে দর-কষাকষির পর শিশুটির বাবা ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও শিশুটিকে ফেরত দেওয়া হয়নি। প্রতিদিন সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান হয় একটি মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে।
পরিবারের অভিযোগ, অপহরণের ঘটনায় আনাস ও ওমায়ের নামের দুজনসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। তাদের দাবি, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা শিশু ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে অপহরণ এবং মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত।
ক্যাম্পের একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, অভিযুক্তরা কথিত ‘আমান উল্লাহ গ্রুপ’-এর সদস্য। তাদের দাবি, মাত্র ১০ দিন আগেও একই চক্র আরেকজনকে অপহরণ করে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে। ওই ঘটনায় মোহাম্মদ নুর নামে একজন আটক হলেও মূল অভিযুক্ত আমান উল্লাহ এখনও পলাতক রয়েছে।
শিশু এলহামের অপহরণের ঘটনায় বিষয়টি ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (৮ এপিবিএন)-কে জানানো হলে তদন্ত শুরু হয়।
এ বিষয়ে ক্যাম্প ইনচার্জ আরাফাতুল আলম জানান, ব্লাস্টের সহায়তায় উখিয়া থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলার সূত্র ধরে একজনকে আটক করা হয়েছে। বাকি অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, ক্যাম্প-৯ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮ এপিবিএনের ইন্সপেক্টর আব্দু রাজ্জাক মোবাইল ফোনে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় জড়িত আনাস নামে একজনকে আটক করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে আটক যুবক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এলাকার একটি ছোট খাল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সোমবার সকালে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ ক্যাম্পে নিয়ে আসা হলে বিকেল ৫টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের খবরে পুরো ক্যাম্পজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্যাম্পের সাধারণ মানুষ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুকে অপহরণ করে মুক্তিপণ নেওয়ার পর হত্যা করার মতো নির্মম ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সম্প্রদায়ের হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
এদিকে ক্যাম্পবাসীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।