চাঁদাবাজির রাজনীতির বাইরে যেতে চাওয়াতেই কি শরীফ ওসমান হাদীর ওপর গুলি?
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। মাহবুব আলম মিনার
বাংলাদেশপন্থী একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টাই কি শরীফ ওসমান হাদীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। নির্বাচনী রাজনীতির দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজি, অর্থনৈতিক রিসাইকেলেশন ও পলিটিক্যাল বিজনেস মডেলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ার পরই তার ওপর হামলার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার কয়েকদিন আগেই শরীফ ওসমান হাদী তার নির্বাচনী প্রচারণার সম্পূর্ণ আর্থিক হিসাব প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনি ১৫ লাখ টাকার নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে আনেন, যা দেশের প্রচলিত নির্বাচনী বাস্তবতায় একেবারেই বিরল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই স্বচ্ছতার উদ্যোগ পুরনো এস্টাবলিশমেন্টের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দেশের প্রচলিত নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রতি ওয়ার্ড থেকে চাঁদা তুলে নেতার নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহ করা একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। তবে বাস্তবে উত্তোলিত অর্থের মাত্র ৬০–৭০ শতাংশ নির্বাচনী কাজে ব্যয় হয়, বাকিটা ওয়ার্ড ফান্ডে থেকে যায় এবং আবার নতুন করে চাঁদা তোলার প্রক্রিয়াতেই ব্যবহৃত হয়। এভাবেই গড়ে ওঠে ক্ষমতার এক দুষ্টচক্র, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ খুব কম নেতারই থাকে।
নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধি হয়ে উঠলে সেই ব্যয়ের অর্থ ফেরত আসে ওয়ার্ডভিত্তিক টেন্ডার, উন্নয়ন প্রকল্প ও নানা কাজের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই রাজনৈতিক ব্যবসায়িক কাঠামোই দেশের নির্বাচনী রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এই প্রেক্ষাপটে শরীফ ওসমান হাদী ছিলেন ব্যতিক্রম। আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ইনসাফের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হাদী পুরনো এস্টাবলিশমেন্টের এই কালচার ভাঙতে দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল—ফজরের নামাজের পর মসজিদ থেকেই জনসংযোগ শুরু করা। যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত ফজরের নামাজ আদায় করাই বিরল, সেখানে তিনি তার রাজনৈতিক আদর্শের সূচনা করেছিলেন ধর্মীয় ও নৈতিক জায়গা থেকেই।
চাঁদাবাজির বাইরে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় ১৫ লাখ টাকা সংগ্রহের ঘটনাকে অনেকেই বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির একটি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। একইসঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় পেইড গ্যাং ব্যবহারের সংস্কৃতিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অবস্থানই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—হাদীর ওপর হামলায় জড়িত দুই অভিযুক্তই ৫ আগস্টের পর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান। মুক্তির পরই তারা তাদের প্রকৃত পরিচয় সামনে নিয়ে আসে। এতে করে অন্তর্বর্তী প্রশাসন এবং জামিন প্রক্রিয়ায় যুক্ত সংশ্লিষ্টদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মত বিশ্লেষকদের।
৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যেই কারা দলের ভেতর থেকে ঘাতক হয়ে উঠতে পারে—এই বাস্তবতা নতুন করে এলার্ম হয়ে উঠেছে। শরীফ ওসমান হাদীর ওপর হামলার ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।