মাহবুব আলম মিনার। ২২ জানুয়ারি ২০২৬
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন উখিয়ার ইনানী রেঞ্জে বন ধ্বংসের ভয়াবহ উৎসব চলছে। বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এবং ভূমিখেকো সিন্ডিকেটের যোগসাজশে অবাধে পাহাড় কাটা, গাছ নিধন ও বনভূমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এখানে এখন বনরক্ষকরাই বনভক্ষকের ভূমিকায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছর ধরে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল-আমিনের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বনাঞ্চল ধ্বংস করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের সঙ্গে আঁতাত করেই এ অপতৎপরতা চালানো হয়। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে জানলেও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে।
ইনানী রেঞ্জের আওতাধীন মনখালী, রাজাপালং, জালিয়াপালং ও ছোয়ানখালী বিট এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট-বড় গাছ কেটে বিক্রি, ঝাউগাছ নিধন, পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি, বনভূমি দখল ও বেচাকেনা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কোথাও গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, কোথাও পানের বরজ ও ব্যক্তিগত বাগান। জালিয়াপালং বিট এলাকায় বিশাল পাহাড় কেটে দালান নির্মাণ করা হচ্ছে। রাজাপালং বিটে পাহাড় কেটে বসতঘর, বাগান ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যান্য বিটের অবস্থাও প্রায় একই।
তথ্যসূত্র জানায়, গত তিন বছরে পাহাড় কাটার সময় অন্তত চারজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি বন উজাড়ের কারণে দুটি হাতির মৃত্যু হয়েছে এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে। ইনানী রেঞ্জের মোট বনভূমির আয়তন প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ২ হাজার ৯৩৩ দশমিক ৬১ হেক্টর আয়তনের শেখ জামাল জাতীয় উদ্যান কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জালিয়াপালং জুম্মাপাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, পাতিনেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে শত শত বছরের পুরোনো পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। এখন একটি পাহাড়ও অবশিষ্ট নেই।
ছোয়ানখালী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আলম বলেন, রাতের অন্ধকারে গাছ কাটা, বালু ও মাটি পাচার করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হয়। রাজাপালং তুতরবিলা এলাকার কৃষক আমিন জানান, দুই বছর আগেও এখানে হাতি ও বন্যপ্রাণীর চলাচল ছিল। এখন হাজারখানেক ঘর গড়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘর থেকে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে রেঞ্জারের নাম ব্যবহার করে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল-আমিন বলেন, আমি এসব কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত নই। কিছু ছোটখাটো অনিয়ম হয়েছে, তবে অনেক উন্নয়নমূলক কাজও হয়েছে। আমরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, ইনানী রেঞ্জ ও জালিয়াপালং বিটের কর্মকর্তারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবহার করে এসব অনিয়মের সংবাদ প্রকাশে বাধা সৃষ্টি ও সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন।
দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, আপনার মাধ্যমেই বিষয়টি জানতে পারলাম। তদন্তে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।