শাকুর মাহমুদ চৌধুরী, উখিয়া:
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার প্রাণকেন্দ্র বাজার সড়কে ঘটেছে এক হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ড। সোমবার (১০ নভেম্বর ২০২৫) বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে মুরগীবাজার সড়কের একটি তোষকের দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের দোকানগুলোতে, এবং ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যায় প্রায় ১৩টি দোকান সম্পূর্ণভাবে, পাশাপাশি ৬টির মতো দোকান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব মিলিয়ে ১৯টি দোকানে প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
সাক্ষীদের বর্ণনায় জানা গেছে, বিকেলের দিকে বাজার সড়কের এক তোষক ও বেড কাভার তৈরির দোকান থেকে হঠাৎ ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে রূপ নেয়। বাতাসের তীব্রতার কারণে আগুন দ্রুত পাশের দোকানগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে, মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাজার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে টানা কয়েক ঘণ্টা কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তাদের সঙ্গে ছিলেন সেনাবাহিনীর বিশাল একটি টিম, বিজিবি, আনসার বাহিনী এবং উখিয়া থানা পুলিশের সদস্যরা। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। উপস্থিত সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আহতদের উদ্ধার, মালামাল সরানো এবং স্থানীয়দের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজে সহায়তা করেন।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে তদারকি করেন উদ্ধার কার্যক্রম। পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় শোকের ছায়া ও বেদনার নিস্তব্ধতা। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন মোহাম্মদ আলী (৬৫)। তার জন্মস্থান নোয়াখালী হলেও গত ৪০-৪৫ বছর ধরে তিনি উখিয়ায় বসবাস করছিলেন। পেশায় তিনি ছিলেন একজন পরিশ্রমী দোকানদার- মুরগীবাজার সড়কে তার ছোট্ট একটি কাপড় ও সেলাইয়ের দোকান ছিল। সেখানে তিনি নিজ হাতে তোষক, বালিশ, বেড কাভারসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
সেই দোকানেই আগুনে দগ্ধ হয়ে জীবন্ত পুড়ে মারা যান তিনি। স্থানীয়রা জানান, তিনি ছিলেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী, বিনয়ী ও পরিশ্রমী একজন মানুষ। তার আংশিক দেহাবশেষ উদ্ধার করে রাতেই উখিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষদের চোখে তখন অশ্রুর ধারা, হৃদয়ে শুধুই বেদনা, একটি পরিবার হারালো তাদের একমাত্র উপার্জনকারীকে, বললেন প্রতিবেশীরা।
আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে কাপড়ের দোকান, মোবাইল দোকান, মুদি দোকান, তোষক তৈরির দোকান, সেলাই সেন্টারসহ আরও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, আগুনে শুধু মালামাল নয়, তাদের জীবনের সঞ্চিত মূলধন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পুড়ে ছাই হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের আর্তনাদে বাজার এলাকা এখনো ভারী। কেউ কেউ ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে কান্না করছেন, কেউবা আশায় তাকিয়ে আছেন সরকারের সাহায্যের দিকে।
স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে নিহত মোহাম্মদ আলীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করা হয়েছে। দোয়া করা হয়, মহান আল্লাহ তায়া’লা যেন আহতদের দ্রুত সুস্থতা দান করেন, নিহতকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন, এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের প্রতি রহমত বরকত বর্ষণ করেন।
ঘটনার পর বাজার এলাকায় শত শত মানুষ ভিড় জমায়। আগুন নেভানোর পরও বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার ও মালামাল উদ্ধারের কাজ। উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।